এমনই শ্রাবণ ছিল

এই এতো নড়াচড়া করছো কেন?একটু চুপ করে থাকতে পারছো না? 

“ঠিক আছে আর নড়বো না। ”


কিন্তু মাদিহা তার বলা এই কথা খুব অল্প সময়ের জন্যই রাখতে পারলো। কিছুটা সময় যেতে না যেতেই সে আবার নড়াচড়া করছে আর উসখুস করছে। তার এই উসখুসের মাত্রাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিতে  শুভ্র আবারও বলে উঠল, 


“আবারও নড়াচড়া করছো তুমি। এভাবে কেউ নড়াচড়া করে? যদি নড়াচড়া করো তবে আলাদা বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ো। আমার চিবুকের মধ্যে আর থাকতে পারবে না। ”


“এই এই কি বললে তুমি তোমার বুকে থাকতে পারবোনা?  একশো বার থাকবো খুব আসছে আমার বুকে থাকতে পারবে না। ” 


“উফ সারাদিন অফিস এক বসের জ্বালা আর বাসায় তুমি। সারাদিন অফিস করেও শান্তি নেই। বাসায় এসে যে একটু ঘুমাবো তারও কোনো উপায় নেই। নিজেও ঘুমাবে না আর আমাকেও ঘুমাতে দিবে না বেশ জোরে জোরে বলে মুখ লুকিয়ে হাসছে শুভ। ”


মাদিহার এই উসখুসের একমাত্র কারণ বাহিরের ঝুম বৃষ্টি । বৃষ্টির সাথে মাদিহার যেন এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।   বৃষ্টি নামলে সে যেন নিজেকে কোনো মতেই ঠিক রাখতে পারে না। বৃষ্টি পানির শীতল স্পর্শ তার চাই। আর যতক্ষণ না সেই শীতল স্পর্শ সে পাচ্ছে ততক্ষণ তার শান্তি নেই । এতটাই বৃষ্টিপাগল মেয়ে যে ফুলসজ্জা রাতেও ছাড় দেয়নি শুভকে । বৃষ্টি বিলাস করে তবেই ছেড়েছে শুভকে । এইতো বছরখানিক পূর্বের ঘটনা। 

শ্রাবণের এক বর্ষামুখর দিন। সকাল থেকেই শুভ্র মা সকলেকে তাড়া দিতে থাকে। একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা। তাই হয়তো তার তাড়া একটু বেশিই।  তাছাড়া সকাল থেকেই মেঘ গুড়গুড় করছিল এইবুঝি থেকে বৃষ্টি  ঝড়বে এমন ভাব। কিন্তু না সম্পূর্ণ দিনে এতটুকু পরিমাণও জল গড়ালো না । বিয়ের কার্যসিদ্ধি   করে বাসায় ফেরা অব্দি সবকিছুই ঠিক ছিল । কিন্তু ব্যঘাতটা ঘটল যখন শুভ ঘরে প্রবেশ করল। ঘরে প্রবেশ করতেই দেখল মাদিহা বেশ উসখুস করছে । মাদিহা এমন উসখুস  করা দেখে বেশ ঘাবরে যায় শুভ। বাহিরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। মাদিহার অস্বস্তি লাগছে ভেবে সবে মাত্র মুখ খুলতে যাবে সে ঠিক তখনই  বধুর সাজে সজ্জিত মাদিহা বলে  উঠল


“এইযে  চলুন?”  


হঠাৎ এমন কথা শুনে শুভর চক্ষু চড়ক গাছ। কোথায় ভেবেছিল অস্বস্তিতে সে উসখুস  করছিল । অথচ এতো পুরোই উল্টো ঘটনা সে তো কোথাও যেতে বলছে। বেশ অবাক আর ভীত হয়ে শুভ বলল,


“চলুন মানে কোথায় যাবো? এই সবেই তো আমরা এলাম। ”


“ধ্যাত আমি কি আর ঐ কথা বলেছি, দেখছেন না বাহিরে কত সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। আমার সাথে ছাদে চলুন। ”


“এ্যাঁ”

“এ্যাঁ নয় হ্যাঁ ”। 


“মাথা খারপ নাকি আমি যাবো না দেখছেন না কি ভাবে বাজ পড়ছে।”

“কি বললেন?  কি বললেন আপনি?  

“ আমি ছাদে যাবো না। আর আজতো কিছুতেই নয়। ”

“আপনি নামবেন নাকি আমি... 

কি আমি কি?  কি করবেন হ্যাঁ কি করবেন?


“কি করব ?  ”বলেই ভ্যাঁ করে কান্না শুরু করে দিল মাদিহা.


“এই এই কি করছেন কি? মুখ চেপে ধরে  বলল শুভ তারপর বলল চুপ চুপ আমি যাচ্ছিতো।”


“ মাদিহা একটা শয়তানি হাসি দিল।  এ হাসি বিজয় অর্জনের হাসি।  তারপর সে বলল, 


“আচ্ছা তাড়াতাড়ি নামুন নাহলে কিন্তু?”


“নামছিতো, সালার কতো স্বপ্ন দেখেছিলাম এই রাত নিয়ে সবকিছুতে মেঘ ভায়া জল ঢেলে দিল। বিড়বিড় করে বলল শুভ ”। 


“এই কি বিড়বিড় করছেন।তাড়াতাড়ি চলুন। বলেই সে ছুট দিল । এমন অবস্থায় কেউ দেখলে কিছুতেই বলবে না সদ্য বিয়ে হয়েছে তার। 


বাড়ির ছাদের চিলেকোঠার বারান্দার এক কার্ণিশে দাঁড়িয়ে কাপছে শুভ। ওপর দিকে মাদিহা দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টি বিলাস করতে ব্যস্ত । বৃষ্টিতে পানি মাদিহার শরীর বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে । এমন সুন্দর  রূপ আগে কখনও দেখেনি শুভ।  সে নিজেকে আর আঁটকাতে পারলো না নিজেকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে  ধরল  তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। 


“ কি হলো মি. এতোক্ষন আপনার রোমান্টিকতা কোথায় ছিল হ্যাঁ? তখন তো আসতে চাইছিলেন না।  এখন আবার আমাকে জড়িয়ে ধরা হচ্ছে । 


“বিধাতার সৃষ্টি  এতোই সুন্দর যে আমাকে আটকাতে পারলাম না ”

ঠিক সেই সময় কাছে কোথাও বাজ পড়ল।  আর মাদিহাও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শুভ কে। 

  

এইভাবে সারাজীবন সারাটাক্ষন আমার সাথে থাকবে তো? প্রতিটা সময় তোমাকে আগলে রাখবো। এতটুকু আঁচড় লাগতে দিবো না। থাকবে তো আমার সাথে? 


“শুভ এই শুভ তুই কাঁদছিস? 


কারো কথায় ধ্যান ভেঙ্গে গেল শুভর। ভাবনার জগৎ  থেকে বেরিয়ে এল বাস্তব জগতে । স্মৃতিচারণে এতোটাই ব্যস্ত ছিল শুভ যে বৃষ্টি থেমে যাওয়া লক্ষই করেনি সে। তার চোখ দিয়ে এখনো টুপটুপ করে অশ্রু ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। তবুও চোখের জল লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো সে। তারপর মিথ্যে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,  


“কই না তো বৃষ্টির জল জমেছে।” 


চল দেরি হয়ে গিয়েছে বলেই হাঁটা শুরু করল শুভ। আজ বছর হয়ে যাচ্ছে মাদিহা পরলোক গমন করেছে শুভ রেখে। ওই হায়েনার দল তার মাদিহাকে বাঁচতে দেয়নি। খুবলে খুবলে খেয়েছে তাকে। সেদিন যদি বৃষ্টির দোহায় না দিয়ে সে মাদিহাকে আনতে যেত।  তাহলে হয়তো আজ এমন দিন দেখতে হতো না। মুহূর্তেই শুভ চোখ  যেন জ্বলজ্বল  করে উঠে সেই চোখে এক রাশ হিংস্রতা আর ক্ষোভ জমে রয়েছে। 


 


Comments

Popular posts from this blog

কুহেলিকা